http://nameofsenary.blogspot.com/সময়ের এক ফোঁড়, আর অসময়ের দশ ফোঁড়’-এটা প্রবাদ। দেশের নদী ভাঙন ঠেকাতে
অসময়ে যে কাজ চলছে তা এই প্রবাদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। শুষ্ক মৌসুমে নদী
ভাঙন রোধে যেসব জায়গায় কাজ করার কথা, সেসব জায়গায় কাজ হয়নি। রাজনৈতিক
বিবেচনায় বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হলেও তার সুফল জনগণ পায়নি। অথচ
গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ আটকে গেছে অর্থের অভাবে। ফলে বর্ষায় তীব্র নদী
ভাঙন দেখা দেয়ায় বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি, বসতবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয়
প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্রিজ-কালভার্টসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
অন্যদিকে, সীমান্ত নদী ভাঙনে দেশ হারাচ্ছে মূল্যবান ভূ-খন্ড। এতে করে বদলে
যাচ্ছে দেশের মানচিত্র। জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় তিস্তা, ধরলা, ইছামতি ও
পদ্মার ভাঙন এতটাই তীব্র যে এটা সামাল দেয়া না গেলে বাংলাদেশ এই বর্ষায় শত
শত একর জমি হারাবে। যা বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে দেশের মানচিত্রের ওপর। যৌথ
নদী কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সীমান্ত নদী ভাঙনে হারিয়ে যাওয়া এসব ভূমি ভারতীয়
অংশে জেগে উঠলে তার ওপর বাংলাদেশের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। বরং ১৯৭৪ সালের
মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি মোতাবেক সীমান্ত নদী যত বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ
করবে-ভারত ততই লাভবান হবে। এই চুক্তি মোতাবেক সীমান্ত নদীর মধ্য স্রোতে
হবে দু’দেশের সীমানা।
সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের ব্যাপক প্রচারণা
চালানো হলেও নদী ভাঙন থেকে মানুষের জমি, বসতবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা
রক্ষার তেমন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ধুঁকছে অর্থাভাবে।
অর্থের সংস্থান না থাকায় অনেক ঠিকাদার কাজ করার আগ্রহ পর্যন্ত হারিয়ে
ফেলছেন। সংসদ সদস্যদেরও নানা অভিযোগ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওপর। তাদের
মতে, প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিতে দিতে
সরকারের মেয়াদই শেষ হয়ে গেছে। এরপরও কেউ সঠিক কথা বলছেন না। পানি উন্নয়ন
বোর্ডের মহাপরিচালকের কাছে গেলে তিনি বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব
সব জানেন। সচিবের কাছে গেলে তিনি জানান, পানি সম্পদ মন্ত্রীর কাছে যান। আর
মন্ত্রীর কাছে ধরনা দিলে জানানো হয়- প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বরাদ্দ না
আসলে কিছুই করার নেই। এমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কি একটি গণতান্ত্রিক
সরকারের জন্য শোভা পায়? এমন প্রশ্ন রেখেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্বাচিত
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ বিশ্বাস। তারমত একাধিক সংসদ সদস্য
জানিয়েছেন, বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে
গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রকল্প। আর সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এসব
প্রকল্প ভোট যুদ্ধে ইস্যু হয়ে দেখা দেবে।
নদী ভাঙন সবচেয়ে তীব্র হয়েছে
দেশের উত্তরাঞ্চলে। বিশেষ করে লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম,
রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদী ভাঙনের কবলে
পড়েছে। এছাড়াও চাঁদপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, সাতক্ষীরা, খুলনা, ভোলা,
পটুয়াখালী, বড়গুনা, বরিশাল ও সিলেট জেলার বিভিন্ন এলাকাও ভাঙছে ব্যাপকভাবে।
শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি দিতে না পারলেও বর্ষায় ভারত বিভিন্ন সীমান্ত নদীতে
দেয়া বাঁধের গেট উন্মুক্ত করে দেয়ায় এবার সীমান্ত নদী ভাঙন আরও প্রকট
হয়েছে। ‘তিস্তা’ নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে গত পৌনে পাঁচ বছরেও বাংলাদেশ
ভারতের সাথে কোন ধরনের চুক্তিতে উপনিত হতে পারেনি। এই নদীর পানি ভাগাভাগির
কথা উঠলেই ভারত বরাবরই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জির প্রসঙ্গ
টেনে চুক্তি থেকে দূরে থেকেছে। মমতাও এর সুযোগ নিয়েছে ষোল আনাই। আর সে
কারণেই শনিবার মমতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখেছেন,
‘তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি নিয়ে এত তাড়াহুড়া কিসের?’ মমতার এই বক্তব্য
অসৌজন্যমূলক এবং বাংলাদেশের জন্য দুঃখজনক। অথচ বাংলাদেশ সরকার ভারতের জন্য
অনেক কিছুই করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে, সন্ত্রাস দমনের নামে ভারতের
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশকে ব্যবহারের অনুমতি;
করিডোর, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রদান; চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর
ব্যবহারের অনুমতি, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অনুমতি, ইছামতির
ওপারে ২৪ কিলোমিটার নদী খননের অনুমতি, ফেনী নদী থেকে ভারি পাম্প ব্যবহার
করে পানি উত্তোলনের অনুমতি, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ত্রিপুরায় খাদ্য নিয়ে
যাওয়া, ত্রিপুরায় এক হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারি
যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি প্রদানসহ ভারত যা যা চেয়েছে তার সবকিছুই
দেয়া হয়েছে। বিনিময়ে তিস্তা নদীর ভাঙন নিয়ে বাংলাদেশকে কষ্ট পেতে হচ্ছে।
জানা
গেছে, সীমান্ত নদী তিস্তা ও ধরলার ভাঙনে কুড়িগ্রামের সুবারকাঠি, জলখানা,
ফকিরের হাট, মোগলবাঘা, হেমেরকুঠি, দলদলিয়া, গোনাইঘাট, কোনাইগাছ ও কাকতৈলসহ
বিভিন্ন এলাকা ব্যাপক ভাঙনের কবলে পড়েছে। তিস্তার ভাঙনে রংপুরের শৈলমারি,
সাঙ্গেরপার, টিলাখাল, বাগডুগড়া, বিজয়বাগ ও মহিপুর এলাকায় চলছে তীব্র ভাঙন।
গাইবান্ধা জেলার গবিন্দী, রতনপুর, বাগুড়িয়া, ফুলছড়ি ও গণকবর এলাকায় ভাঙন
এতটাই তীব্র হয়েছে যে, স্থানীয় এলাকাবাসী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপরও ক্ষোভ
প্রকাশ করছে। এসব জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকতারা জানান, ভাঙন প্রতিরোধে
দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। অর্থ সঙ্কটের কারণে
ভাঙন প্রতিরোধের সাময়িক কাজও করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক এলাকায় ঠিকাদাররা আর
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের কথার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে
তারা ভাঙন প্রতিরোধে নতুন করে অর্থ ঢালতে নারাজ।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা
রাজশাহীর চরখিদিরপুর ও চরখানপুরের। এখানে খিদিরপুরে বিজিবি ক্যাম্প ভেঙে
নদী গর্বে চলে গেছে। আর চরখানপুরের বিজিবি ক্যাম্পটি রক্ষার প্রাণান্ত
প্রচেষ্টা চলছে। স্থানীয় পাউবো কর্মকর্তা জানান, পদ্মার ভাঙন এতটাই তীব্র
যে চরখানপুরের ক্যাম্পটি রক্ষা করা যাবে কিনা-তা নিয়েও আমরা সন্দিহান।
বর্তমানে পদ্মা খিদিরপুরে ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩শ’ মিটার দূরে রয়েছে।
আর চরখানপুরে সীমান্ত পিলার থেকে নদী ১শ’ মিটার দূরে রয়েছে। রাজশাহীতে
পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে চরখিদিরপুর বিজিবি ক্যাম্প রক্ষায় ইতিমধ্যে অর্ধকোটি
টাকা ব্যয় হয়েছে। পদ্মার ভাঙন থেকে রাজশাহীর পবা উপজেলার চরখিদিরপুর ও
চরখানপুর বিজিবি ক্যাম্প দুটি রক্ষার জন্য পাউবো গত ২৫ জুলাই থেকে
ক্যাম্পের পাশে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করে। এ নিয়ে বিজিবি সদস্যদের
অভিযোগ, ক্যাম্পটি রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে অসময়ে। তার পরও ঠিকাদারের
লোকজন ঠিকমতো ব্যাগ ফেলতে পারেননি। একদিন তার বালি থাকে না, আরেক দিন ব্যাগ
থাকে না। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে এই সর্বনাশ ত্বরান্বিত হয়েছে।
নদী
ভাঙনরোধে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায়- জানতে চাইলে যৌথ নদী কমিশনের সাবেক
সদস্য তৌহিদুল আনোয়ার খান ইনকিলাবকে বলেছেন, সময়ের কাজ অসময়ে করলে নদী ভাঙন
রোধ করা যাবে না। তিনি বলেন, সীমান্ত নদী ভাঙন ঠেকাতে সরকার উদ্যোগী না
হলে দেশের মানচিত্রে তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তার মতে, সীমান্ত নদী
এলাকায় ওপারে ভারতের পরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বাংলাদেশ অংশে ভাঙন আরও
তীব্র করেছে।
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক মো.
হাবিবুর রহমান ইনকিলাবকে বলেছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
যাতে করে শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। তার
মতে, শুধুমাত্র বর্ষায় ভাঙন ঠেকাতে অস্থায়ীভিত্তিেেত কিছু কাজ করেই বসে
থাকলে চলবে না। শুষ্ক মৌসুমে যাতে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ
নেয়া যায়, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ নদী ভাঙনরোধ যেমন সম্ভব
নয়; তেমনি সীমান্ত নদী ভাঙনের কবল থেকে দেশের মূল্যবান ভূমি রক্ষা করাও
সম্ভব নয়।

No comments:
Post a Comment